রাজধানীর মিরপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাইশটেকী, বাউনিয়া ও জয়নগর খালগুলো ফের দখল ও ময়লা জমে গেছে। এইসব খালগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে সংযুক্ত। এই খালগুলোয় একসময় ট্রলার চলতো। বিভিন্ন স্থানে খেয়াঘাট ছিল। মানুষ খাল পারাপার হতো নৌকায়। খালের পানিও ছিল স্বচ্ছ। মানুষ গোসল করতো। তবে এখন এসব অতীত, বাস্তবতা ভিন্ন।
মিরপুরের উত্তর-পূর্বাংশের এই তিন খাল নানাভাবে বেদখল হয়ে ক্রমেই সরু হয়ে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও ছোট নালায় পরিণত হয়েছে। ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে পরিস্থিতি এমন যে খালগুলোর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়াও অসম্ভব। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এই খালগুলো পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে। অনেক অংশ ইতোমধ্যে পরিষ্কার করে খালের পানির প্রবাহ ঠিক রেখেছে। এতে স্থানীয়দের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। তারা বলছেন, যেভাবে খালগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে ডিএনসিসি চাইলে এসব খাল উদ্ধার করা সম্ভব।
২০২০ সালে ওয়াসা থেকে খালগুলো বুঝে নেয় ডিএনসিসি। এরপর থেকে খালগুলো পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ নেয় নগর কর্তৃপক্ষ। নিয়মিতই উত্তরের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম খালগুলো পরিদর্শন ও ধাপে ধাপে পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেন। এতে বর্ষায় জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমেছে। এখন আর দিনব্যাপী জলাবদ্ধতায় থাকতে হচ্ছে না স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খাল উদ্ধার করা হোক।
সিটি করপোরেশনের নথি অনুযায়ী, বাইশটেকী খালের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৮০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৪০ ফুট। তবে দুটি স্থানে খালটি সরু হয়ে নালার আকৃতি ধারণ করেছে। এই দুটিকে ডেডস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিএনসিসি। এর মধ্যে ১০ নম্বর ডি ব্লকের পূর্বে জুটপট্টি ও পলাশনগরের ভেতরে খালের একটি অংশ সরু হয়ে গিয়েছে, যা মিলিত হয়েছে বাউনিয়া খালের সঙ্গে। এছাড়া সাংবাদিক প্লট থেকে আসা একটি অংশ মদিনানগর আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে এসে বাইশটেকী খালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। খালের এই অংশটুকু সবুজ বাংলা আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে মদিনানগরের পুরো অংশটাই দুই ফুটের মতো চিকন নালায় রূপান্তর হয়েছে। এ ছাড়া বাইশটেকী খাল ঘেঁষে প্রায় অংশজুড়ে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
বাইশটেকীর স্থানীয় বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী সাইফুল বলেন, ছোটবেলায় এই খালটা অনেক বড় ছিল। পরে এলাকার প্রভাবশালী লোকেরা এই খালের পাড় দখল করে প্লট বানিয়ে দখলে নেয়। নিয়মিত খাজনা দিয়ে এখন প্লটগুলো স্থায়ী করে নিয়েছে। এই খালের নতুন ইমাননগরের কোনায় একটা গুদারাঘাট ছিল। এখন তো দেখলে মনে হয় এটা ডাস্টবিন।
মিরপুর কালাপানি খালের পর থেকে শুরু হয়েছে বাউনিয়া খাল। এর এক পাশে ভাসানটেক, আরেক পাশে পলাশনগর। এটি কালশী-ইসিবি সড়ক সেতু থেকে শুরু হয়ে বাইশটেকীর ওপর দিয়ে ইমাননগর হয়ে জয়নগর খালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। খালটির শুরুর অংশ এখনও বেশ প্রশস্ত রয়েছে। তবে খালের দুই পাড়ে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই যদি এই খাল রক্ষা ও সংস্কারের কাজ করা না হয়, তাহলে এটিও প্রভাবশালীদের দখলে যাবে। ইতোমধ্যে বাইশটেকী থেকে ইমামনগর অংশে খালের পাশ ঘেঁষে অবৈধ ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে বলে দাবি তাদের। ফলে কিছুটা সরু হয়েছে এই অংশ। মাস চারেক আগে এটি পরিষ্কার করা হলেও আবারও ময়লা জমা শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া এই খালের শেষ অংশে গভীরতা কমে গেছে। ফলে ভারী বৃষ্টিতে আশপাশের এলাকায় পানি ওঠে। পাড় ডুবে যাওয়ায় ময়লা পানি দিয়েই পার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। তবে খালটিতে ঢাকা ওয়াসার সীমানা পিলার দেখা গিয়েছে।
বাউনিয়াবাঁধ এলাকার বাসিন্দা জয়নাল চেয়ারম্যান বলেন, এই খাল ঘেঁষেই বাঁধ তৈরি করার কারণে এলাকার নাম হয় বাউনিয়াবাঁধ। কিন্তু এখন বাঁধ থেকে খালটি অনেক দূরে সরে গেছে। এখানে মাটি ভরাট করে বড় বড় কোম্পানি ভবন তৈরি করছে। জানি না কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ। তবে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে খালের দুই পাড়। এই খালটা রক্ষা করা খুব জরুরি। এই খালের কারণে মিরপুরের এই অংশ আর ভাসানটেক এলাকায় কোনও জলাবদ্ধতা তৈরি হয় না।
মিরপুরের খালগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থানে আছে জয়নগর খালটি। এটি বাইশটেকীর শেষ সীমানা থেকে শুরু হয়ে মিরপুর ১৪-এর ডেন্টাল কলেজের পাশে এসে শেষ হয়। এটির পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক আছে। স্থানীয়দের দাবি, খালটি একসময় অপরিচ্ছন্ন থাকলেও এখন নিয়মিত পরিষ্কার করায় ময়লা জমছে না। তবে আশপাশের নির্মাণাধীন ভবনের আবর্জনা খালটির পাড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। তাই এই খালের পাড় সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। খাল উদ্ধারে জিরো টলারেন্স নীতি মানা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই চার বছরে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। মেয়াদকালের শেষ এক বছর খাল পুনরুদ্ধারে বেশি গুরুত্ব দেবো।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

ফের বেদখলে বাইশটেকী বাউনিয়া ও জয়নগর খাল
- আপলোড সময় : ১০-০৭-২০২৪ ১২:৫১:১১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১০-০৭-২০২৪ ১২:৫৩:১৮ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ